আবারও দস্যুদের কবলে সুন্দরবন। পাঁচটি দস্যু বাহিনী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে গোটা বনাঞ্চল। দুবলাচরের জেলেপল্লী ও সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে প্রতিদিনই অপহৃত হচ্ছেন জেলেরা। লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়াতে হয় তাদের। একদফা দস্যুমুক্ত হবার পর ফের এই সমস্যা নিয়ে অসহায় সুন্দরবনের মানুষ।
জানা যায়, দুবলার চর শুটকি পল্লী নামে পরিচিত। যেখানে পদচারণা থাকে লাখানিক জেলে ব্যবসায়ীর। প্রতিবছর অর্থনীতিতে যোগান দেয় শত শত কোটি টাকা। এ চরে ২৫ বছর ধরে ব্যবসা করেন আব্দুল হাকিম। কয়েকদিন আগে সাগরে মাছ ধরা অবস্থায় তারই একজন জেলে অপহরণের শিকার হন।
ব্যবসায়ী আব্দুল হাকিম বলেন, ‘আমার এই বোটটা রাত্রে যাইতে যেয়ে নন্দবালের ওখানে গেলে এই ডাকাতি সিগন্যাল দেয়। অপহরণ করে নিয়ে যায় আমার মাঝিকে। পরে ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা দিছি বিকাশে। পরে আমার ওই লোককে ছেড়ে দিছে।
দস্যুতা ও ডাকাতির কারণে আব্দুল হাকিমের মত দুবলার চরের হাজারো ব্যবসায়ী এখন আছেন মহাসমস্যায়। এ একজন ব্যবসায়ীর অধীনে কাজ করেন ২০ থেকে ৫০ জন জেলে শ্রমিক। তাদেরও দিন কাটছে চরম আতঙ্কে।
এক জেলে শ্রমিক বলেন, আবার উৎপাত শুরু হয়েছে। এটা আপনার ওই ২৪ সাল থেকে শুরু হয়েছে। আর এখন বৃহৎ আকার ধারণ করেছে।
আরেকজন জেলে শ্রমিক বলেন, বিগত বেশ কিছু বছর ধরে জলদস্যুর প্রভাবটা খুব কম ছিল। কিন্তু এ বছর সমুদ্রে আসার পর থেকে দেখছি কিছু জলদস্যুর প্রবণতা অনেক বেশি।
গত এক মাসে সুন্দরবন অঞ্চলে অপহৃত হয়েছেন অন্তত ৫০ জেলে। প্রাণভয়ে অধিকাংশ ঘটনাতেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে কেউ অভিযোগ করে না। দস্যুরা শুধু বোনের ভেতরেই নয়, মোংলার লোকালয়ের রিসোর্ট ব্যবসায়ী ও পর্যটকদেরও অপহরণ করছে।
স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, বেশি ভয় হলো দস্যু। পথে আসতে একটা ধরিছে। তার ২ লাখ ২০ হাজার টাকা নিয়ে ছেড়ে দিয়েছে।
আরেকজন বলেন, ২ লাখ করে মাথাপিছু টাকা চাইছে। তাহলে আমারা কিভাবে কাজ করবো। কীভাবে আমরা এই ২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে আমাদের লোকগুলো উদ্ধার করব?
রিসোর্ট ব্যবসায়ী বলেন, সুন্দরবনে যখন দস্যুতা বেড়ে যায় তখন কিন্তু আমাদের গেস্ট কমতে থাকে। বার্নিং হয়ে যায় যে সুন্দরবনে দস্যু আছে। আর দস্যুর নামটা শুনলেই মনে হয় যে যে কারোর ওপরে হামলা করতে পারে।
২০১৮ সালের ১ নভেম্বর তৎকালীন সরকার সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করে। সাংবাদিক মোহসীন-উল হাকিমের মাধ্যমে র্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করেন ৩২টি বাহিনীর ৩৫০ দস্যু। কিন্তু আত্মসমর্পণ করা সেই ব্যক্তিদের অনেকেই ফের নেমেছেন দস্যুতায়।
সাংবাদিক মোহসীন-উল হাকিম বলেন, আগের পৃষ্ঠপোষকদেরকে আসলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, একদমই হয়নি। কারা অস্ত্র তাদেরকে সাপ্লাই দিয়েছে, কারা তাদের গুলি বেচত, কারা তাদের এই উপরের যে নেটওয়ার্কগুলো মেনটেন করত—এই মানুষগুলোকে কিন্তু ধরা হয়নি। আর সেই কারণে যে ওই মানুষগুলো এখন আবার একটু একটু করে বেরোচ্ছে।
সুন্দরবনে এখন পাঁচটিরও বেশি বাহিনী প্রকাশ্যে দস্যুতা করছে। এর মধ্যে বেশি শোনা যায় জাহাঙ্গীর, সুমন, শরীফ ও করিম বাহিনীর নাম।
কোস্টগার্ড কর্মকর্তা বলেন, কোস্টগার্ড কিন্তু গত প্রায় দুই বছর ধরে সাড়াশি অভিযান পরিচালনা করে সুন্দরবনে। ১৭টা স্টেশন আউটপোস্টের মাধ্যমে আমরা কিন্তু ২৪ ঘণ্টা, দিনরাত ২৪ ঘণ্টা আমরা আমাদের পেট্রোলিং কার্যক্রম পরিচালনা করছি।
বাঙালিদের মাছের স্বাদ পূরণ করতে সুন্দরবনের জেলেরা যে নিজের জীবনকে বাজি রাখে বা কত কষ্টকর একটা জীবন পার করতে হয়, তা নিজের চোখে না দেখলে কারো বিশ্বাস হবে না। এ ভয়ঙ্কর কষ্টকর জীবনের ওপর যদি জলদস্যুদের প্রভাব বা জলদস্যুদের ভয় তাদের মনে জেকে বসে, তাদের কষ্টটা আরো দ্বিগুণ বা তিন গুণ বেড়ে যায়। এ অবস্থায় খেটে খাওয়া মানুষদের দাবি দ্রুত জলদস্যু এই সমস্যার সমাধান করতে।