দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক কয়েকটি লড়পড়—শ্রীলংকার অর্থনৈতিক বিস্ফোরণ, বাংলাদেশে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন কোটা বাধা থেকে বিস্ফোরিত আন্দোলন, এবং এখন নেপালে সামাজিক মাধ্যম নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে জেন-জি-কেন্দ্রিক বিক্ষোভ—একযোগে দেখাচ্ছে কিভাবে ছোট ইন্ধনে বড় আগুন জ্বলে উঠতে পারে। নেপাল সারাক্ষণ তথ্যচক্র ও তরুণদের অনলাইন সংগঠনের কারণে কেবল কয়েক দিনেই রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় এত গভীর ক্ষত তুলেছে যে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগে পৌঁছেছে; সহস্রাধিক আহত ও বহু প্রাণহানির ঘটনা সামনে এসেছে, পার্লামেন্ট ও সরকারি ভবন আক্রমণে ভস্মীভূত হয়েছে এবং মন্ত্রী, পরিবারের সদস্যরা হেলিকপ্টার বা সেনাবাহিনীর সাহায্যে পালাতে বাধ্য হয়েছেন—শুধু একটা সিদ্ধান্ত (সামাজিক মাধ্যম বন্ধ) ছিল বিকট অনুঘটক, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে ছিল দীর্ঘদিনের বেকারত্ব, দুর্নীতি ও তরুণদের ভবিষ্যৎহীনতা। www.ndtv.com+3Reuters+3Al Jazeera+3
এই ঘটনার সঙ্গে শ্রীলংকার ২০২২ সালের বিপর্যের মেলবন্ধন সুস্পষ্ট: শ্রীলংকার ক্ষেত্রে মূল চালক ছিল অর্থনীতি—বহুসংখ্যক বৈদেশিক ঋণ, রাজস্বঘাটতি, কৃষি-নীতির ভুল, ও জ্বালানি-অভাব। নাগরিকদের দৈনন্দিন জিনিসপত্রের অভাব ও নগদ জীবিকার সংকট যখন সীমা পার করে, তখন গণরোষ দ্রুত শাসনপ্রথাকে প্রচণ্ডভাবে অচল করে দিতে পারে; ২০২২ সালে তখনকার রাষ্ট্রপ্রধান দেশে ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। শ্রীলংকার ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয়—যদি মানুষের মৌলিক জীবিকা দুর্বল হয়, রাজনৈতিক আস্থা ভেঙে পড়ে, এবং প্রতিষ্ঠান ঘিরে কোনো প্রতিকার না থাকে, তাহলে ক্রমশ ‘স্বতঃস্ফূর্ত বিস্ফোরণ’ আকার নেয়। Reuters+1
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের কোটা-সংক্রান্ত ছাত্র আন্দোলনও দেখিয়েছে কিভাবে এক নির্দিষ্ট পদক্ষেপ (সরকারি চাকরিতে কোটার প্রসঙ্গ) তরুণ-শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর অস্বস্তিকে এক রাজনৈতিক সংকটে রূপান্তরিত করতে পারে—নির্যাতন বা তথ্য-নিষেধের চেষ্টা করলে সেই ক্ষোভ বহুগুণ বাড়ে। বাংলাদেশের ঘটনায় আদালত সিদ্ধান্ত, ইন্টারনেট বন্ধ, এবং নিরাপত্তা বাহিনীর পদক্ষেপগুলো আন্দোলনকে আরও তীব্র করেছে—এখানেও শিখণীয় যে সরকারী কৌশলগুলি যখন স্বাভাবিক রাজনৈতিক চ্যানেলকে অকার্যকর করে দেয়, তখন বাধাটি দ্রুত বিস্তৃত গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হতে পারে। Reuters+1
তাহলে—ভারত? কেন এখানে একই রকম ঢেউ না উঠবে (অথবা উঠবে)? প্রথমত, ভারতের রাজনৈতিক কাঠামো এবং জনমত প্রকাশের ইতিহাস আলাদা: ১৯৫০ থেকে বঞ্চিত অনেক সুযোগের পরও সংসদীয় নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বারবার ক্ষমতা বদলিয়েছেন, এবং মানুষের মনে এখনও একটা কিছুকালীন আস্থা রয়েছে যে ভোটের পথ দিয়ে পরিবর্তন সম্ভব। দ্বিতীয়ত, ভারতের অর্থনৈতিক চিত্রেও ভিন্ন স্তর: স্টক-মার্কেট, খুচরা বিনিয়োগ এবং শহুরে মধ্যবিত্তের বিপুল সংখ্যা এমন কিছু সামাজিক-অবিবর্তনীয় বাফার দেয় যা সামান্য শকগুলোকে চাপে ফেললেও দেশের গোটা কাঠামোকে এক ধাক্কায় ভেঙে দেয় না। তবে এটাও সত্য—ভারতের গভীরে ব্যাপক ব্যঞ্জন আছে: উচ্চশিক্ষিত কিন্তু বেকার তরুণ, খাদ্য ও বিনিয়োগমূল্যবৃদ্ধি, আঞ্চলিক বৈষম্য, এবং রাজনৈতিক বিভাজন। ভারতও আগে কৃষক আন্দোলন ও নাগরিকত্ব-বিরোধী গণআন্দোলন দেখেছে—এসব প্রমাণ করে যে, শক্ত সংগঠিত দাবির সামনে সরকারও ঝুঁকি মেনে নেবার পথ বেছে নিতে পারে (ফসল আইন প্রত্যাহার ইত্যাদি)। Reuters+1
কোন সংযোজকগুলো একে ‘নেপাল হুবহু’ বানাতে পারে? কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত আছে — সবগুলো একসঙ্গে সত্য হলে বিপদ বাড়ে:
সামগ্রিক অর্থনৈতিক আঘাত — খাদ্য, জ্বালানি, বা মজুরিতে হঠাৎ ধরনের সঙ্কট;
যুব সংঘর্ষ ও কর্মহীনতা — তরুণরা যদি এমনি এমনি ‘কেউ-না-পাইলেই’ সংগ্রহে নেমে আসে;
তথ্য ও যোগাযোগ অরক্ষিততা — সোশ্যাল মিডিয়া-নিষেধ বা তথ্যচুরির চেষ্টা তরুণদের আরও একত্রিত করে;
রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি শূন্যতা — দুর্নীতির স্পষ্ট আলামত থাকলে ক্ষোভ গৃহীত হয়; এবং
নিরাপত্তা বাহিনীর সিদ্ধান্ত — সেনাবাহিনী বা পুলিশ যদি নিরপেক্ষতা না রাখে বা ভুল বোঝাবুঝি করে তখন পরিস্থিতি দ্রুত নতুন বিন্যাসে চলে যায়। এসব উপাদান একসঙ্গে গেলে যে দেশেই হোক বিপদ বাস্তব হতে পারে। (নেপাল, শ্রীলংকা ও বাংলাদেশের যে ঘটনার মূল শিক্ষাগুলো বের হয়, সেগুলোও ঠিক এই সামগ্রিক কারণগুলোর মিশ্রণই।) Financial Times+1
কী করা উচিত — একখানা নীতি-খসড়া:
জনগণের মৌলিক জীবিকা রক্ষায় সামাজিক সুরক্ষার জোরদারকরণ; বেকার যুবসমাজকে কাজে লাগানোর লক্ষ্য নিয়ে স্বচ্ছ কর্মসংস্থানের নীতি;
ন্যায্য, দ্রুত ও স্বচ্ছ দুর্নীতি তদন্ত; ক্ষমতাবলে থাকা ব্যক্তিদের সম্পত্তি-সূত্র অনুসন্ধান ও জবাবদিহি;
গণসংযোগের পথ বন্ধ না করা—ইন্টারনেট বা তথ্যযন্ত্র বন্ধকরণ প্রায়শই ক্ষোভকে বাড়ায়; বিকল্প হলে তথ্য সীমিত করলেও স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও প্রতিকার দেখাতে হবে;
নিরাপত্তা বাহিনীর দায়িত্ব হলো নিয়ন্ত্রণে থাকা, কিন্তু জনগণের প্রতি অযথা বল প্রয়োগ করলে প্রতিক্রিয়া মারাত্মক হয়; তাই পুলিশ-প্রশিক্ষণ ও আইনগত অডিট জরুরি;
রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মগুলোর অভাব হলে তরুণেরা নতুন সংগঠন গড়ে তুলবে—তাই রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে প্রাসঙ্গিক সংস্কার প্রয়োজন।
সমাপ্তি: নেপালের সাম্প্রতিক সংঘাত শুধু একটি দেশীয় ঘটনা নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার একটি সতর্কবার্তা—একই উপাদানগুলো বিভিন্ন দেশে ভিন্ন-ভিন্ন সময়ে একই ফল দিতে পারে। ভারতের কিছুকালীন বিরলতা এবং নির্বাচনী রেওয়াজ তাকে কিছুটা টেকসই রাখছে, তবে সম্পূর্ণ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই। সমাধান হলো রক্ষার না; উৎসাহের — অর্থনৈতিক সুব্যবস্থা, ন্যায্যতা ও অন্তর্ভুক্তিকরণ; এসবই হলো আগামীর সবচেয়ে কার্যকর অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা।