বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় এখন জুলাই ঘোষণাপত্র এবং জুলাই জাতীয় সনদ। রাজনৈতিক দলগুলো একে কেউ দেখছে নতুন সামাজিক চুক্তি হিসেবে, কেউ বলছে এটি সংবিধানের শ্রেষ্ঠত্বের জন্য হুমকি। এ নিয়ে জনপরিসরে যেমন বিতর্ক তীব্র হচ্ছে, তেমনি সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মাঝেও সৃষ্টি হয়েছে গভীর উদ্বেগ।
সংবিধান রাষ্ট্রের গ্র্যান্ড ম্যানুয়াল—রাষ্ট্র পরিচালনার মূল কাঠামো, নাগরিক অধিকার ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার সংবিধিবদ্ধ দলিল। সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদ স্পষ্ট করে বলেছে, সংবিধানই প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন। অন্য কোনো আইন যদি এর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তবে তা বাতিল বলে গণ্য হবে। এই সাংবিধানিক শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত করতে বিচার বিভাগের হাতে আছে বিচারিক পর্যালোচনা (Judicial Review)-এর ক্ষমতা। এর মাধ্যমে অতীতে পঞ্চম, সপ্তম ও পঞ্চদশ সংশোধনীর মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাতিল হয়েছে।
কিন্তু জুলাই সনদের খসড়া পরিস্থিতিকে এক নতুন মোড়ে নিয়ে যাচ্ছে। খসড়ায় বলা হয়েছে, “সনদের প্রতিটি বিধান, প্রস্তাব ও সুপারিশ সাংবিধানিক ও আইনগতভাবে বলবৎ হিসেবে গণ্য হবে” এবং “এর বৈধতা বা প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না।” অর্থাৎ, এক প্রকার অকর্তনীয় ও অপরীক্ষণযোগ্য দলিল হিসেবে সনদকে সংবিধানের ওপরে স্থান দেওয়ার প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এখানেই মূল বিতর্ক। সংবিধানের শ্রেষ্ঠত্বকে পাশ কাটিয়ে সনদকে প্রাধান্য দেওয়ার এই প্রয়াস এক ধরনের সাংবিধানিক নৈরাজ্য (Constitutional Anarchy) সৃষ্টি করতে পারে। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কাজী জাহেদ ইকবালের মতে, সংবিধানকে সনদের মুখোমুখি দাঁড় করানো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন এবং বিপজ্জনক।
প্রশ্ন উঠছে, যদি সনদের বিধান সংবিধানের ঊর্ধ্বে থাকে, তাহলে বিচার বিভাগ তার সাংবিধানিক দায়িত্ব কীভাবে পালন করবে? সংবিধানের মৌলিক কাঠামো অক্ষুণ্ণ রাখা, নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং সংসদের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা নিরীক্ষা করা—এসবই এখন অনিশ্চয়তার মুখে। বিচারিক পর্যালোচনার সীমাবদ্ধতা মানে কার্যত সংবিধানের রক্ষাকবচ দুর্বল হয়ে যাওয়া।
বিশ্ব ইতিহাসে যুদ্ধোত্তর বা বিপ্লবোত্তর পরিস্থিতিতে সামাজিক চুক্তি বা জাতীয় সনদের উদাহরণ আছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ পরবর্তী গণঐক্যের ঘোষণা কিংবা ফরাসি বিপ্লবের পর নতুন নাগরিকতান্ত্রিক চুক্তি তার প্রমাণ। কিন্তু বাংলাদেশে পরিস্থিতি ভিন্ন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সর্বসম্মত ঐকমত্য অনুপস্থিত। ফলে সনদকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া একদিকে যেমন অনিশ্চিত, অন্যদিকে রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও গভীর করার ঝুঁকি তৈরি করছে।
রাজনীতিতে স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য সংবিধানের মৌলিক কাঠামো দুর্বল করা কখনোই শুভ পরিণতি ডেকে আনে না। ইতিহাস বলে, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে “প্রশ্নহীনতার সংস্কৃতি” তৈরি করে আওয়ামী লীগ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে বিপদে পড়েছিল। যদি এবার জুলাই সনদকেও সংবিধানের ওপরে স্থান দেওয়া হয়, তবে নৈরাজ্যের সাংবিধানিকীকরণ (Constitutionalizing Anarchy) ঘটবে—যার ক্ষতিকর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর পড়বে।
এখন প্রশ্ন হলো—সংবিধানের রক্ষাকবচ কে?
বিচার বিভাগ কি এই দায়িত্ব পালন করতে পারবে, যদি সনদের মাধ্যমে তার ক্ষমতাই সীমিত করে দেওয়া হয়? রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া কোনো সনদ কতটা বৈধতা পাবে? এবং সবচেয়ে বড় কথা, জনগণের অভিপ্রায় কি এই প্রক্রিয়ায় প্রতিফলিত হবে?
বাংলাদেশের গণতন্ত্র, বিচার ব্যবস্থা ও সংবিধান আজ এক সংকটময় সড়কসংধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি স্বল্পমেয়াদি কায়েমি স্বার্থে সংবিধানের শ্রেষ্ঠত্বকে পাশ কাটায়, তবে তা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
এখনই প্রয়োজন সংবিধানকেন্দ্রিক ঐকমত্য গড়ে তোলা,
যেখানে সংবিধানই হবে সর্বোচ্চ রক্ষাকবচ,
না যে কোনো সনদ, না যে কোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত।